ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার, ক্রিকেটার কিংবা ফুটবলার, আরো অনেক স্বপ্ন। ছোট বেলার সেই দেখা স্বপ্ন পূরণ হয়ে ক’জনের? কেউ স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখেন, কেউ আবার সারা জীবন বয়ে বেড়ান স্বপ্নকে না ছুঁতে পারার আক্ষেপ। অনেকে আবার অজান্তেই হয়ে যান অন্য কিছু, যা তাকে দেয় অপার আনন্দ। ক্রিকেট বিশ্বে এমন কিছু ক্রিকেটার আছেন, যাদের শুরুটা অন্য পেশায়। কিন্তু পরে হয়ে উঠেছেন ক্রিকেটের মহাতারকা।

ছোটবেলা থেকেই সমস্যাটা ছিল তার। হঠাৎ হঠাৎ বুকটা কে যেন চেপে ধরতো, জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিলেও বুকে বাতাস পেতেন না; একটু ব্যথা টের পেতেন। সমস্যাটা কাউকে কখনো বুঝতে দেননি। মজায়, হাসিতে উড়িয়ে দিয়েছেন সবকিছু। ব্যাটিং করতে গিয়ে এমন হলে একটু বসে পড়ে পানি খেয়ে আবার শুরু করতেন। কাউকে টের পেতে দিতেন না।

সেবার অস্ট্রেলিয়া সফরে আর পারলেন না। ব্যথা বেড়ে গেল, নিঃশ্বাস নিতেই পারছিলেন না। ভর্তি হলেন হাসপাতালে। ডাক্তাররা জানালেন, হার্টের ভাল্বে সমস্যা; অস্ত্রোপচার করাতে হবে। জীবনে কখনো ঘুমের ওষুধও খাননি; অপারেশন তো দূরের কথা। ভয়ে মরে যাওয়ার উপক্রম হলো। তারপরও অপারেশন হলো। জ্ঞান ফিরল। একা একা শুয়ে আছেন পোস্ট অপারেটিভ টেবিলে। আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব কেউ নেই পাশে। ভীষণ একা মনে হচ্ছিল নিজেকে। তারপরও পৃথিবীতে ফিরতে পেরে দারুণ খুশি। মনে মনে বললেন, “শুরু হলো আমার বোনাস জীবন। বাকি এই জীবনে আর কখনো আফসোস করব না। বাকি জীবনটা হবে আমার শুধু উপভোগের। আনন্দ দেবো আর আনন্দ নেবো।” হ্যাঁ, বিশ্বজুড়ে আনন্দ বিলিয়ে বেড়ানো এক ‘দানব’ হয়ে উঠেছেন তিনি। তিনি আর কেউ নন; তিনি ক্রিস্টোফার হেনরি গেইল, ওরফে ক্রিস গেইল!

বোলারদের কাছে তিনি রীতিমতো যমদূত। টি-টোয়েন্টির আসর মানেই বস্তা বস্তা টাকা নিয়ে ক্রিস গেইলের দরজায় ফ্র্যাঞ্জাইজিগুলোর ধরনা দেয়া। কথা রাখেন গেইলও। ব্যাট হাতে ঝড় তোলেন ২২ গজে। সাজান চার ছক্কার ফুলঝুরি। ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টগুলোতে তার পারিশ্রমিক দিতে হিমশিম খেতে হয় ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোকে। অথচ জ্যামাইকার হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম তার। থাকতেন টিনের ঘরে। খাবারের অভাবে কুড়াতেন পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল। অর্থাভাবে একবার চুড়িও করেছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই ব্যাটিং দানব।

ভালোমন্দ খাবারের চেয়ে পিটুনিই বেশি খেতেন। পেটাতেন মা। গেইল খুব সুবোধ বালক ছিলেন না, এটা যে কেউ অনুমান করতে পারেন। স্কুল ফাঁকি দেওয়া, মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়ানো, খাবার জন্য জেদ করা; এসব কারণে অহরহ মার খেতেন। পায়ের জুতো থেকে শুরু করে ঝাড়ু; সবকিছু দিয়ে পেটানো হতো। এভাবেই জীবনটা হয়তো কেটে যেত। হয়তো জ্যামাইকার রাস্তায় আরেকটা ভবঘুরে, নেশাগ্রস্ত যুবক হিসেবে বড় হয়ে উঠতেন। কিন্তু ছেলেটার জীবন বদলে দিলো লুকাস ক্রিকেট ক্লাব। গেইল বলেছেন, “লুকাস না থাকলে আমি আজ কোথায় থাকতাম জানি না; হয়তো রাস্তায়। লুকাস ক্রিকেট ক্লাবের পরিচর্যাই আমাকে গেইল করে তুলেছে।”